মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার তালিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সারা বাংলাদেশের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামেও পাক হানাদার বাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটে। আর ঠিক সে মূহুর্তে ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের স্থানীয়দের সংগঠিত করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং সম্মুখ যুদ্ধে শাহাদাৎ বরণ করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। আর তাই তারই সম্মানে যে স্থানে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন সে স্থানে তার প্রতিকৃতি নির্মিত হয়েছে। খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি মহাসড়কে মহালছড়ি উপজেলায় প্রবেশমুখে মহালছড়ি কলেজের পাশে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্যের অবস্থান।

                                                            

 

শহিদ আফতাবুল কাদের ভাস্কর্য

শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের বীর উত্তম এর জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর দিনাজপুর শহরে। তবে পৈত্রিক গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার (তৎকালীন বৃহত্তর নোয়াখালী) রামগঞ্জ থানাধীন টিওড়া গ্রামে। পিতা স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন পুরাতন ঢাকার ফরিদাবাদ এলাকার লাল মোহন পোদ্দার লেনে। সেখানেই অকুতোভয় এই সৈনিকের শৈশব কাটে। পিতা মরহুম আব্দুল কাদের ছিলেন ইংরেজ আমলের একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, মাতা রওশন আরা বেগম ছিলেন গৃহিনী। পিতার সরকারি চাকরির সূত্র ধরে বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থান করেছেন। তাঁর কৈশোর, তারুণ্যও কেটেছে তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহ শহরের মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৬ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ইংরেজিতে স্নাতক (সম্মান) এ ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী ক্যাপ্টেন আফতাব ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে আর্টিলারি কোরে কমিশন প্রাপ্ত হন এবং ১৯৭০ সালে হায়দ্রাবাদ ক্যান্টনমেন্টে ৪০ ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগদান করেন।

’৭১ এর শুরুতে বেজে উঠে যুদ্ধের ডামাডোল। ৫ ফেব্রুয়ারি ক্যাপ্টেন আফতাব ছুটি নিয়ে আসেন বাংলাদেশে। এর মাঝে কেটে যায় কিছু দিন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তাঁকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, দেশ-মাতৃকার টানে তিনি জেগে উঠেন দৃপ্ত প্রেরণায়। মার্চের উত্তাল আন্দোলনে তিনি নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। ২৫ মার্চের কালো রাতে পাক বাহিনী শুরম্ন করে বর্বোরচিত নিধন যজ্ঞ। ঐ দিন ক্যাপ্টেন আফতাব ফরিদাবাদে পৈত্রিক বাসভবনে অবস্থান করছিলেন।

২৮ মার্চ ১৯৭১। মাকে বন্ধুর বাসায় যাবার কথা বলে যুদ্ধে অংশ নিতে ক্যাপ্টেন আফতাব চট্টগ্রামের পথে বেরিয়ে পরেন। ফেনী এলাকায় গিয়ে তিনি শুভপুর যুদ্ধে ইপিআর বাহিনীরসাথে যোগ দেন। শুভপুর ব্রীজ এলাকায় তখন পাক বাহিনী হেলিকপ্টারের সাহায্যে ছত্রী সেনা নামাচ্ছিল। পাক ছত্রীসেনাদের একজনকে ক্যাপ্টেন আফতাব কিছুসংখ্যক প্রামবাসীর সহায়তায় ধরে ফেললেন। পাকিস্তানি ঐ ছত্রীসেনাকে ধরে নিয়ে ২ এপ্রিল রাতে পৌঁছান রামগড় শহরে। এ সময় সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়া রামগড়ে হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ৩ এপ্রিল থেকে শুরু হয় ক্যাপ্টেন আফতাব এর ব্যস্ত জীবন। ইপিআর বাহিনীর হাবিলদার কালামের প্লাটুন নিয়ে স্থাপন করেন জোরালগঞ্জের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। নেতৃত্ব দেন ধূমঘাটের রেলওয়ে ব্রীজ উড়িয়ে দেবার অপারেশনে। ৫ এপ্রিল বিকট আওয়াজে ঘূমঘাটের রেলওয়ে ব্রীজটি উড়ে গেল। রামগড়ে ফিরে এসে ক্যাপ্টেন আফতাব দেখলেন যে, বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালী জেলার কয়েকশ ছাত্র ও যুবক সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ৫০০ তরুণের একটি দলকে সামরিক প্রশিক্ষণ দানের লক্ষ্যে ক্যাপ্টেন আফতাব রামগড় হাইস্কুল মাঠে স্থাপন করলেন একটি ট্রেনিং সেন্টার। স্থানীয় জনগণ এসকল যুবকের থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করলেন। ওদিকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআর বাহিনীর সদস্যরা পাকবাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার কাজে নিয়োজিত থাকলো। সম্ভবতঃ ২০ এপ্রিল মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের একটি সেনা দল ৮/৯টি জীপে করে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। এ সময় মেজর মীর শওকত খাগড়াছড়ি শহরে অবস্থান করছিলেন। মেজর শওকতকে খাগড়াছড়ি থেকে সঙ্গে নিয়ে মেজর জিয়া এ সেনাদলটি নিয়ে মহালছড়িতে পৌঁছান। মহালছড়ি ছিল মেজর শওকাতের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান। ক্যাপ্টেন আফতাব এবং ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান মেজর জিয়ার সঙ্গে এই সেনাদলের সাথে মহালছড়িতে পৌঁছান। মেজর মীর শওকতের নেতৃত্বাধীন বাহিনী কালুরঘাট ব্রীজ এলাকা থেকে পিছু হটে কাপ্তাই ও রাঙ্গামাটি হয়ে এরই মধ্যে মহালছড়ি এলাকায় এসে অবস্থান নিয়েছিল। মেজর মীর শওকত বাহিনী তখন প্রবল চাপের মুখে ছিল। এদেরকে নিরাপদে রামগড়ে রিট্রিট (Retreat) করাবার জন্যই মেজর জিয়া অতিরিক্ত সেনাদল নিয়ে মহালছড়িতে পৌঁছান। মেজর শওকতকে রামগড়ের উদ্দেশ্যে পশ্চাদাপসারণের নির্দেশ দিয়ে মেজর জিয়া ফিরে গেলেন রামগড়ে। ক্যাপ্টেন আফতাব থেকে গেলেন মহালছড়িতে।

মহালছড়িতে পৌঁছার পর পাক-বাহিনীর সর্বশেষ অবস্থান জানার জন্য ক্যাপ্টেন আফতাবকে একটি রেকিপার্টি নিয়ে রাঙামটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবার জন্য মেজর শওকত নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পেয়েই ক্যাপ্টেন আফতাব সন্ধ্যা নাগাদ রাঙামাটি শহর সংলগ্ন মানিকছড়িতে রেকি পার্টির সদস্যদের নিয়ে পৌঁছে গেলেন। সেখান থেকে রাতের অন্ধকারেই লঞ্চে করে রাঙামাটি শহরের উপকষ্ঠে পৌঁছলেন। রাঙামাটিতে পৌঁছা মাত্রই স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক কর্মী এসে সংবাদ দিলেন যে, রাঙ্গামাটি শহরটিতে পাক বাহিনী এসে ভরে গেছে। কাজেই সামনে এগুনো কোনমতেই উচিত হবে না। স্থানীয় গাইডদের সহযোগিতায় লঞ্চটি ঘুরিয়ে বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের বাড়িতে নিয়ে ভিড়ানো হল। রাতে ওখানেই বিশ্রামের সিদ্ধান্ত নিলেন ক্যাপ্টেন আফতাব। গ্রামটি ছিল দ্বীপের মত। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নৌকা বা লঞ্চে করে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প ছিল না।

সম্ভবতঃ ২১ এপ্রিল ৭১। তখন সকাল ৯টার মতো হবে। রেকি পার্টির সকলেই তখন খাবার-দাবার নিয়ে ব্যস্ত। এসময় আকাশ ভেঙে গর্জে উঠলো মেশিনগান এবং এলএমজি’র একটানা ফায়ারিং এর শব্দে। দূরে দেখা গেল কাপ্তাই লেকের জল ভেঙ্গে এগিয়ে আসছে শত্রুর দু’টি স্টিলবডি লঞ্চ। ক্যাপ্টেন আফতাবের বুঝতে অসুবিধা হল না যে, শত্রম্ন তাদের অবস্থান জেনে গেছে। রেকি পার্টির সদস্যরা বুঝে উঠতে পারছিল না কে কী করবে এবং কোথায় অবস্থান নেবে। এরই মেধ্য ক্যাপ্টেন আফতাব এর এলএমজি গর্জে উঠলো। ক্যাপ্টেন আফতাবের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শওকত হোসেন। মাত্র ৭ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র শওকত ছিল অসীম সাহসী ছেলে। কোন অবস্থাতেই যুদ্ধ ক্ষেত্র ছেড়ে এক মুহূর্তের জন্যও এদিক সেদিক যাবার মত ছেলে নয়। ক্যাপ্টেন কাদেরের দেখাদেখি এরই মধ্যে সঙ্গী সৈন্যরা সুবিধামত স্থানে অবস্থান নিয়ে শত্রুর লঞ্চ দু’টিকে লক্ষ করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। শত্রু পক্ষের কয়েকজন হতাহত হল, ক্যাপ্টেন আফতাবের একজন এলএমজিম্যান আহত হল। তার প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য ছাত্র শওকত ও অন্য দু’জন গাইডকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হল রাঙামাটিতে। এক ঘণ্টা ধরে চলল ব্যাপক গুলি বিনিময়। শত্রু কোনভাবেই লঞ্চ দু’টি তীরে ভিড়তে না পেরে পিছু হটে গেল।

ক্যাপ্টেন আফতাব ঐদিন এবং রাতে সেখানেই থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজ সেনাদলের সদস্যদেরকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তুললেন। উদ্দেশ্য শত্রু যখন তাদের অবস্থান জেনেই গেছে, তখন পরদিন তারা আবারও এই স্থানে আক্রমণ করতে আসবে। আর ঐরূপ পরিস্থিতিতে শত্রুর উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা সম্ভব হবে। কিন্তু পরদিন (সম্ভবতঃ ২৩ এপ্রিল) শত্রু এলো না। পরদিন রাতেও ক্যাপ্টেন আফতাব ঐ অবস্থানে থেকে গেলেন শত্রুর আক্রমণের অপেক্ষায়।

২৪ এপ্রিল ’৭১। এদিন সংবাদ এলো মেজর শওকতের কাছ থেকে। এখনই তাকে মহালছড়িতে ফিরে যাবার নির্দেশ দেয়া হল। নির্দেশ মতো ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের রওয়ানা দিলেন মহালছড়ির উদ্দেশ্যে। বুড়িঘাটে এসে দেখা হল লেফটেন্যান্ট মাহফুজ, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, হাবিলদার সায়ীদ এবং হাবিলদার তাহেরসহ আরো অনেকের সাথে। বুড়িঘাট থেকে রওয়ানা হয়ে যখন ক্যাপ্টেন কাদেরদের লঞ্চটি একটি দ্বীপে (কাপ্তাই লেকের মধ্যে পাহাড়গুলোকে দ্বীপের মতোই মনে হয়) এসে ভিড়লো তখনই পাক বাহিনীর একটি ধাবমান লঞ্চ এসে পৌঁছল সেখানে। বন্দুকভাঙ্গায় ক্যাপ্টেন আফতাব এর বাহিনীকে না পেয়ে শত্রুপক্ষ কয়েকটি লঞ্চে করে পুরো লেক এলাকায় তাঁদেরকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। শত্রুপক্ষের অতর্কিত আক্রমণে ক্যাপ্টেন আফতাব এর সদস্যরা এদিক সেদিক ছিটকে পড়ে। শুরু হয় ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত গুলিগোলা বিনিময়। শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন আফতাব এর পাশে থেকে যান হাবিলদার সায়ীদ এবং হাবিলদার তাহের। এদের দু’জনের হাতে ছিল এলএমজি। তিনটি এলএমজি’র অনবদ্য গুলি বর্ষণের ফলে শত্রুপক্ষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পিছু হটে যায়। এক ঘণ্টা ধরে চলছিল বুড়িঘাটের এই যুদ্ধ। শত্রুপক্ষ পিছু হটে যাবার পর নিজ বাহিনীর সদস্যদেরকে একত্রিত করে মহালছড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন ক্যাপ্টেন আফতাব। সাথে লে. মাহফুজ, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান আরো কয়েকজন। মুক্তিবাহিনীর অবস্থান তখন সুবিধাজনক ছিল না। উপর্যুপরি বিমান আক্রমণ চলছিল। রামগড় দখলে নেবার জন্যও পাক বাহিনী তখন সর্বাত্মক প্রস্ত্ততি নিচ্ছিল। মহালছড়িতে তখন ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত সেনা দলগুলোকে একত্রিত করার কাজ চলছিল। উদ্দেশ্য শত্রুপক্ষের উপর শেষ আঘাত হানা।

এদিকে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড হামলার মুখে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পাকবাহিনী তাদের শক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। তারা মিজোরামের দু’টি বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্যদের নিজ দলে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে। অন্যদিকে স্থল আক্রমণের সাথে সাথে বিমান ও হেলিকপ্টারের সাহায্যেও শুরু করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্ভাব্য অবস্থান-ঘাঁটির উপর প্রবল হামলা। এ অবস্থায় পার্বত্য এলাকায় পূর্ব ট্রেনিংবিহীন মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। রসদ এবং গোলাবারুদ সংকটও দেখা দেয় তাদের। এই প্রতিকূল ও দুর্বল মুহূর্তে ২৭ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে পাকবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানি সৈন্য (১৩৬জন) এবং একটি মিজো ব্যাটালিয়নকে (১০০০জন) সঙ্গে নিয়ে আক্রমণ চালায় মহালছড়িতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর। মেজর মীর মওকত এবং চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের প্রকৌশলী ইসহাকের নেতৃত্বে ঐ সময় শত্রম্নদের আক্রমণ প্রতিহত করা হচ্ছিল। এর মধ্যে পাকবাহিনী হেলিকপ্টারযোগে দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের আরও এক কোম্পানি সৈন্য এখানে নামিয়ে দিয়ে যায়। দুই পক্ষের প্রচন্ড এ যুদ্ধের মধ্যে বেলা তিনটায় ক্যাপ্টেন আফতাব এর নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি মহালছড়ি এসে পৌঁছে। অসীম সাহস আর সুদক্ষ যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করে টগবগে তরুণ সেনা অফিসার আফতাব সঙ্গীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রু মোকাবিলায়। তাদের এ সম্মিলিত কঠিন প্রতিরোধের মুখে মিজো বাহিনী প্রথম অবস্থায় পিছু হটতে শুরু করে। এতে পাকসেনারা বেপরোয়া হয়ে উঠে। তারা মিজোদের সামনে রেখে একটার পর একটা আক্রমণ চালিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। প্রতিবারই মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা জবাব দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে শত্রুদের। মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ করে বেপরোয়া গুলি ছুঁতে ছুঁড়তে এগিয়ে যায়। তিন চারগুণ অধিক সংখ্যক শত্রু পক্ষ বীভৎস উল্লাস ধ্বনি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় চারিপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। চরম এ বিপজ্জনক অবস্থায় সহযোদ্ধারা পশ্চাদাপসরণের পরামর্শ দেন ক্যাপ্টেন আফতাবকে। কিন্তু অকুতোভয় তেজদীপ্ত বীর সেনানী সহযোদ্ধা ছাত্র শওকত, ফারুক এবং দুই ইপিআর সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে তিনটি এলএমজি’র অবিরাম গুলি বৃষ্টি কোণঠাসা করে ফেলে শত্রুদের। এই চরম মুহূর্তে হঠাৎ এক সহযোদ্ধার এলএমজি’র ফায়ারিং বন্ধ হয়ে যায়। শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার জীবনকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার তিনটি এলএমজি’র একটি অচল হয়ে পড়ায় অস্থির হয়ে পড়েন ক্যাপ্টেন আফতাব। মেরামতের জন্য দ্রুত অস্ত্রটি তাঁর কাছে নিয়ে আসার নির্দেশের পরও সহযোদ্ধা শওকতের আসতে খানিক দেরি হওয়ায় যুদ্ধরত আফতাব নিজেই ক্রলিং করে এগিয়ে যেতেই শত্রুর অস্ত্রের কয়েকটি গুলি এসে বিঁধে তাঁর ডান বগলের কয়েক ইঞ্চি নিচে এবং পেটের বাম পাশে। গুলিবৃষ্টির মধ্যেই গুরুতর আহত আফতাবকে বহন করে একটু নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন শওকত, ফারুক ও ইপিআরের ড্রাইভার আববাস। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য জিপ গাড়িযোগে রামগড় আসার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাংলার এ তরুণ বীরযোদ্ধা। তখনও তাঁর বিয়ের মেহেদী হাত থেকে মুছে যায়নি। ঐদিন শেষ বিকেলে সহযোদ্ধা ফারুক, শওকত ও ড্রাইভার আববাস বীর শহিদের মরদেহ নিয়ে রামগড় এসে পৌঁছলে এখানে সকলের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। সন্ধ্যার প্রাক্কালে রামগড় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ মোস্তফার পরিচালনায় শহিদ আফতাব এর জানাজা নামাজ শেষে কেন্দ্রীয় কবরস্থানে পূর্ণ সামরিক ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৩ সালে সরকার ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরকে মরণোত্তর ‘বীর উত্তম’ উপাধীতে ভূষিত করে।

রামগড়ের যুদ্ধ

১ এপ্রিল, ’৭১-এ বিদ্রোহী ইপিআর বাহিনীর হালিশহর এবং ২ এপ্রিল কোর্ট হিলের অবস্থান দু’টি পাকবাহিনীর দখলে চলে যাবার পর থেকে পুরো চট্টগ্রাম বন্দর নগরীটির পতন ঘটে। ৩০ মার্চেই পুরো বন্দরনগরী চট্টগ্রাম একটি জন-মানব শূন্য শহরে রূপ নিয়েছিল। এরই মধ্যে অন্যান্য জেলার জনসাধারণ বিভিন্ন পথে নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে শহর ত্যাগ করে যায়। ১ এপ্রিল থেকেই সীমান্ত সংলগ্ন ফেনী নদীর তীরে অবস্থিত তৎকালীন ছোট মহকুমা শহর রামগড় হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সশস্ত্র প্রতিরোধ-সংগ্রামের পাণকেন্দ্র। ফেনী নদীর অপর পাড়ে খুব নিকটেই ছিল ভারতীয় মহকুমা শহর সাবরুম। দু’টি মহকুমা ভিন্ন দেশের হলেও রামগড় এবং সাবরুমের জনগণ একে অপরের সাথে পরিচিত ছিল সুদীর্ঘকাল ধরে। ৩০ মার্চ ইপিআর বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী ক্যাপ্টেন রফিক এবং ১ এপ্রিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের নেতৃত্ব দানকারী মেজর জিয়াউর রহমান ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সাবরুমে ভারতীয় বিএসএফ-এর কর্মকর্তাদের সাথে অস্ত্র-শস্ত্র ও গোলা-বারুদ দিয়ে সাহায্য করার জন্য আবেদন করেন। বিএসএফ কর্মকর্তাদের নির্দেশে ক্যাপ্টেন রফিক সাবরুম থেকে চলে যান আগরতলায়। এদিকে মেজর জিয়া সাবরুমে দেখা করেন ভারতীয় বিএসএফ এর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান ব্রিগেডিয়ার পান্ডের সাথে। মেজর জিয়া এসময় কালুর ঘাট ব্রীজ এলাকায় অবস্থানকারী তাঁর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। ওদিকে ক্যাপ্টেন রফিকের অনুপস্থিতিতে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী ইপিআর বাহিনীর সদস্যরা জেসিও এবং এনসিওদের নেতৃত্বে যে যার মত প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ক্ষয়ক্ষতিও হয় ব্যাপক। ২ এপ্রিল তেলিয়া পাড়ায় ব্রিগেডিয়ার পা--র সাথে দেখা হয় মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশারফ ও মেজর শাফায়াত জামিলসহ কয়েকজন বিদ্রোহী সেনা অফিসারের সাথে। ঊর্ধ্বতন বিদ্রোহী সেনা অফিসারগণ সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ৪ এপ্রিল তেলিয়া পাড়ায় একটি কনফারেন্সে যোগ দেবার জন্য রামগড়ে অবস্থানরত মেজর জিয়াকে সংবাদ পাঠানো জন্য ব্রিগেডিয়ার পান্ডেকে অনুরোধ করেন। ওদিকে আগরতলায় সংলগ্ন কোনবন এলাকায় ঢাকা শহর থেকে ২ এপ্রিল পালিয়ে আসা কর্নেল (অবঃ) এম এ জি ওসমানী, এমএনএ-কে ব্রিগেডিয়ার পান্ডে দ্বিতীয় ও চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্থায়ী হেডকোয়ার্টার তেলিয়াপাড়া নিয়ে আসেন।

তেলিয়াপাড়া কনফারেন্সের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালী অঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় মেজর জিয়াউর রহমানকে। ব্রিগেডিয়ার পান্ডের অনুরোধ এবং তেলিয়াপাড়া কনফারেন্সের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম শহরটি পুনর্দখলের জন্য ক্যাপ্টেন মতিনের নেতৃত্বে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি ঐদিন সন্ধ্যার মধ্যেই রামগড়ের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কোম্পানি দু’টি ভারতীয় ভূখন্ডের ওপর দিয়ে কয়েকশ মাইল পাহাড়ী রাস্তা পেরিয়ে ৫ এপ্রিল রাতে রামগড়ে গিয়ে পৌঁছে। ২ মে সকালে পাকিস্তানিরা রামগড়ের উপর ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে বসে। আর্টিলারির শেলিং-এর ফায়ার কাভার করে এগিয়ে এসে তারা করের হাট-রামগড় রাস্তাকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেঙে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসী লড়াইয়ের পরও পতন হয় রামগড়ের।